পানিপথ যুদ্ধ - মারাঠি বীরত্ব না ইতিহাসের বিকৃতি?

غير معرف


আশুতোষ গায়কোয়াড় ''পানিপথ'' নামে একটি চলচ্চিত্র মুক্তি দিতে যাচ্ছে, যা পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ অবলম্বনে নির্মিত। ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জানুয়ারি মকর সংক্রান্তির দিন এ যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। যুদ্ধে প্রধান বিবাদমান পক্ষ হলো দুররানী সাম্রাজ্যের আহমদ শাহ আবদালী বনাম মারাঠা কনফেডারেটের সদাশিব রাও বাহু।
আশুতোষ গায়কোয়াড়রের একটি প্রধান সমস্যা হল সে প্রায়ই ইতিহাস বিকৃতিতে লিপ্ত হয়। যদিও এর কোনো প্রয়োজন নেই। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের পর্যাপ্ত দলিল-দস্তাবেজ ইতিহাসবিদদের হাতে আছে। এক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয় ও প্রণিধানযোগ্য হলো স্যার যদুনাথ সরকার এর "ফল অফ মুঘল এম্পায়ার", লক্ষ্নৌর নবাব সুজাউদ্দৌলার দরবারী কাশীরাজ পন্ডিতের নিজ হাতে লিখিত দলিল দস্তাবেজ, যা এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতায় কয়েক ভলিয়মে সংরক্ষিত আছে। এই পন্ডিত কাশীরাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে। তিনি এ যুদ্ধ থামাবার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। ডাফের "হিস্ট্রি অফ মারাঠা ", এটিও একটি উল্লেখযোগ্য বই।
এছাড়া মারাঠা পক্ষেও পর্যাপ্ত দলিল-দস্তাবেজ আছে। সুতরাং আশুতোষ গায়কোয়াড়ের উচিত হবেনা ইতিহাস বিকৃতি করা। ইদানিং ভারতের একটা ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে মধ্যযুগের মুসলিম শাসকদের ভিলিফাইড করা ও হিন্দু জাতীয়তাবাদকে চেতনাফাইট করা।
মারাঠাদের উত্থানপর্ব সেই শিবাজী আমল থেকে শুরু করে ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়টাকে ধরলে দেখা যাবে, মারাঠারা মূলত গেরিলা আক্রমণে বেশিরভাগ সময় ব্যাপৃত থেকেছে। মারাঠা বর্গীরা চৌথ ও সরদেশমুখী নামক খাজনা আদায়ে সব সময় ব্যস্ত থেকেছে। এ সময় মারাঠা বর্গী রঘুনাথ রাও ও তার সেনাপতি ভাস্কর রাও পন্থ ১৭৪০-৪৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা-বিহার-উরিষ্যাকেও বিপন্ন করে গিয়েছে। তাই সত্য করে বললে মারাঠা বর্গীদের কোন গৌরবজনক ইতিহাস নেই। লুট, অগ্নিসংযোগ, ফসলের খেত পুড়িয়ে দিয়ে লোকালয়ে কে বসবাসের অগম্য করে দেয়াই মারাঠাদের একটা পরিচিত পদ্ধতি ছিল। এক্ষেত্রে মারাঠারা সেক্যুলার ছিল তারা এসব করার সময় হিন্দু-মুসলমান কাউকে ছাড় দিতো না।
আর মারাঠা কনফেডারেটের অধিনায়ক সদাশিব রাও বাহু সত্যিকার অর্থেই একজন বীর ছিলেন। এতে কোনো সন্দেহই নেই। তাকে যদি দুররানি সম্রাট আহমদ শাহ আবদালীর সাথে যুদ্ধ করতে না হতো তাহলে উপমহাদেশে মারাঠারা সত্যিকার অর্থেই একটি প্রভাববিস্তারকারী জাতীয়তাবাদী বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠতে পারতো। এই গেরিলা যুদ্ধ ,চৌথ সরদেশমুখী খাজনা আদায়কারী লুটেরা বাহিনী বুঝতে পারে নাই যে ,একটা সর্বাত্মক পেশাদারী বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করতে গেলে কী পরিণতি হতে পারে।
প্রকৃতপক্ষে দুররানি সম্রাট আহমদ শাহ আবদালির বাহিনী ছিল পূর্বেকার আফ্রাসিয়াব সম্রাট নাদির শাহের পরাক্রান্ত বাহিনীর একটি পরিবর্তিত রূপ। এই বাহিনীর শুধু সেনাপতি বদল হয়েছে ,বাহিনীর যুদ্ধ সক্ষমতা প্রায় আগের মতোই রয়ে গেছে। তবে এটাও ঠিক দুররানি সম্রাট আহমদ শাহ আবদালী মারাঠা কনফেডারেটের বাহিনীর মতো যুথবদ্ধ বাহিনী শেষ ২৫ বছরে দেখেন নাই। উপমহাদেশকে নিয়ন্ত্রণ করার মত শক্তিশালী এই দুই পক্ষ পরস্পরের মাজা ভাঙতে গিয়ে নিজেরাই দুর্বল হয়ে পড়ে। উপমহাদেশে ইংরেজ শাসন ত্বরাম্বিত হয়। ইংরেজরা লড়াইয়ে কোনরকম অংশগ্রহণ ছাড়াই জিতে যায়। এটাই প্রকৃষ্ট লড়াই।
রাজপুতানার জয়পুরের মাধু সিং ও ভরতপুর বল্লভগড়ের সুরাজমল সদাশিব রাও বাহুকে আফগানদের সাথে সর্বাত্মক যুদ্ধে লিপ্ত হতে মানা করে। একমাত্র তারাই পারফেক্ট ভবিষ্যৎবাণী করতে পারে যে, আফগানদের সাথে সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে কখনো জিতা যায় না। মারাঠাদের সেরা সেরা বীরেরা সেই যুদ্ধে প্রাণ হারায়।
সদাশিব রাও বাহু ও তার ভাই বিশ্বাস রাও যুদ্ধক্ষেত্রেই নিহত হয়। ইব্রাহিম কার্দি, আন্তাজি মানিকেশ্বর, জাঙ্কজি সিন্ধিয়া , শমশের বাহাদুর (বাজিরাও মাস্তানির পুত্র) প্রত্যেককে বন্দি করে আবদালীর সামনে আনা হয়। সেখানেই তাদের শিরচ্ছেদ করা হয়।
মারাঠারা চিরকালের জন্য ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ে। তারা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পেনশনভোগীতে পরিণত হয়। পরবর্তীতে এই মারাঠারা ও হায়দ্রাবাদের নিজামরা মহীশুরের টিপু সুলতানের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। তাদের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য মহীশূরের বাঘ টিপু সুলতান ইংরেজদের সাথে বীরের মতো লড়েই মৃত্যুবরণ করেন।
মজার ব্যাপার হলো , হিন্দুত্ববাদীরা আজকের ভারতে সেই পেনশনভোগী মারাঠা বীরদের নিয়েই ইতিহাস রচনা করতে চায় । আর স্বাধীনতাকামী টিপু সুলতানের ভূমিকাকে তারা ইতিহাসের বই থেকে মুছে ফেলতে চায়।
Copyright Aditya Kingshuk

Getting Info...
Cookie Consent
We serve cookies on this site to analyze traffic, remember your preferences, and optimize your experience.
Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.